Rajat Ganguly: থিয়েটার করার কথা কখনও ভাবেননি তিনি, একপ্রকার জেদের বসে ‘বহুরূপী’ থিয়েটারে ঢুকে পড়া শুধুমাত্র কুমার রায়ের সাথে কাজ করার লোভে। এক সংবাদমাধ্যমে এরকমই নিজের জীবন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে দেখা গেলো বর্ষীয়ান অভিনেতা রজত গাঙ্গুলিকে। সবিস্তারিত আলোচনা করলেন তাঁর জীবন ও সিনেমা জগৎ নিয়ে। ৫টা পর্যন্ত ব্যাংকের চাকরি, তারপর চলত ৬.৩০-এ থিয়েটার এইভাবে উভয়দিক সামলে কাজ করে যেতেন তিনি। এই ‘বহুরূপী’ থেকে যাত্রা শুরু হয়ে একে একে টেলিভিশন ও সিনেমা। কিন্তু অভিনেতার আজ আর আফসোসের কিছু নেই, তাঁর কথায়, “যতটা পাওয়ার ছিল আমার ধারণা তার থেকে বেশি পেয়ে গেছি”।
বাবার ও স্ত্রীর সহযোগিতায় ২০০৩ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে নিজেকে অভিনয় জগতে প্রতিষ্ঠা করাটা সত্যিই প্রশংসনীয়। অতনু ঘোষের ‘এবং কম্পিউটার ‘ নামের একটি ধারাবাহিক দিয়ে টেলিভিশনে পদার্পণ করেছিলেন রজত গাঙ্গুলি।তখনকার ধারাবাহিক আর এখনকার ধারাবাহিকের মধ্যে পরিবর্তন কতটা লক্ষণীয়?
প্রশ্ন শুনেই তিনি উত্তরে বললেন “অনেকটা লক্ষণীয়, অনেকটা লক্ষণীয় মানে, ধারাবাহিকের ধরনটা পাল্টে গেছে। একটা গল্প নিয়ে সিরিয়াল হতো, তার একটা ডেফিনেট গল্প ছিল। ডিরেক্টরদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ছিল আফটার অল ডিরেক্টর হলেন ফাদার অফ আ টিম সে সিরিয়ালি হোক। এখন ডিরেক্টরের হাত থেকে অনেক ক্ষমতা চলে গেছে এখন চ্যানেল তারাই বেশিটা করে।ফলে আমার মনে হয় তাতে সিরিয়ালের লাভ তো হয়নি বরং ক্ষতিই হয়েছে। আর একটা জিনিস আমাদের এত সাহিত্যের ভান্ডার আমাদের বাংলায় সেই সাহিত্য নিয়ে কাজটা বন্ধ হয়ে গেলো। এখন অন্যরকম গল্প সব একই রকম গল্প যাদের কিছু করবার নেই তারা বসে বসে দেখে। কিন্তু ইয়াং জেনারেশন সিরিয়াল আর দেখে না আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি। এরকম বহু লোককে দেখেছি তারা নিজেদের করা সিরিয়াল নিজেরা আর দেখে না। আমিও দেখতাম না পরের দিকে আর দেখতে ভালো লাগতো না।”
সেই সঙ্গে জানালেন টানা অনেকদিন কোনো সিরিয়ালে আর অভিনয় করতে চাননা এই প্রবীণ অভিনেতা ওটা খুব ক্লান্তিকর হয়ে গেছে। রোজ শুটিংয়ে যাওয়া একটা বয়সের পর আর ভালো লাগেনা বলেই এই সিদ্ধান্ত তাঁর। তিনি আরও জানালেন, “আগে শুটিং করতে গেলে সকালে উঠে একটা আনন্দ হতো। সেই আনন্দটা ধীরে ধীরে চলে গেলো।” ইন্ডাস্ট্রির কাজের ধরনের জন্যই তাঁর এই অনিচ্ছা জন্মায় বলেই জানালেন তিনি।
থিয়েটারের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা অভিনেতার। দর্শকদের সাথে সরাসরি যোগস্থাপনের আনন্দ এখনও অনুভব করেন তিনি। ইন্ডাস্ট্রির কাজ কমে যাওয়া ও সিস্টেমের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হতাশ কণ্ঠে বলেন, “আগে সিনেমা যত যত্ন করে বানানো হতো এখন সেটা আর হয়না। তার প্রভাব তো আমরা দেখতে পাই। আগে একটা সিনেমা হলে সেটা প্রচুর দর্শক দেখত সেটা নিয়ে কফি হাউসে আলোচনা হতো, নন্দনে আলোচনা হতো। তখন ৪৫-৪০ বা তারও বেশি দিন ধরে একটা ছবির শুটিং হতো। এখন সেখানে এগারো , বারো দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তো কেউ তো আর ম্যাজিশিয়ান নয় বা ভগবান নয় যে সেই মানের কাজ এগারো দিনে শেষ করে ফেলব! বা আমি সত্যজিৎ রায় নই, আমি মৃণাল সেন নই, আমি তপন সিনহা নই, আমি তরুণ মজুমদার নই অথচ এগারো দিনে আমাকে করতে হবে। এটা একটা দিক থেকে ডিরেক্টরদের স্মার্টনেস আছে নাহলে প্রডিউসার তোমাকে কাজ দেবে না। তা সত্ত্বেও যে কজন ডিরেক্টর ভালো সিনেমা করছে সেটা তাদের করিশ্মা ক্যালিবল। কিন্তু সবাই তো আর একই ক্যালিবলের লোক নয় সেখানে ওই ফ্যাক্টরির মতো হয়ে যাচ্ছে। অন্তঃসার শূন্য সিনেমা তৈরি হচ্ছে! সেই সিনেমায় কাজ করতেও যে খুব একটা ভালো লাগে তা নয়।”
বাজেট কমছে তাই ছবির মানও কমছে অকপট অভিনেতা। খুব কম ছবি প্রযোজকের যা খরচা সেটা ফেরত করতে পারছে। ফলত ছবির সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলেই মত তাঁর। শিল্পীসত্ত্বার স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বিশেষত ডিরেক্টরদের।
এবার জিতের আগত সিনেমা ‘কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকত’ ছবিতে জজ-এর ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যাবে অভিনেতাকে। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পরে জিতের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, “যা হয় একটা অভিনেতা পর পর আরও অভিজ্ঞ হয় জিতের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। আর ওঁ খুব ভালোবেসে অভিনয়টা করে তো। ভালো লেগেছে ওর সাথে কাজ করে।”
‘নধরের ভেলা ‘ -এর মতো কিছু ভালো ছবি হল পাচ্ছে না। এরকম কিছু বিপুল প্রশংসিত ছবিগুলোর হলে জায়গা না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ভালো ডিরেক্টর ও প্রডিউসার আসবেই না। যারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মেকিং করেন রিলিজি না করতে পারলে আসবেন কেন? এই সমস্ত মানুষের হাতে হল এগুলো কোনো সুস্থতার লক্ষণ নয়। কমিটি তৈরি হচ্ছে কাজ কোথায় হচ্ছে! কি উপকারটা হচ্ছে। উন্নতি যদি করতেই হয় একটা ডিরেক্টর যখন আসবে কন্ট্রোলিং অথরিটির দায়িত্ব তাঁকে স্বাধীনতা দেওয়া। সে যেন তার মনের মতো করে কাজ করতে পারে। সেটাই হচ্ছে না তাহলে আর কি লাভ হচ্ছে?” এরকমই কিছু মূল্যবান উপদেশ দিলেন প্রৌঢ় অভিনেতা।
তারপর নিজের স্ত্রী ও ছেলের সাথে অবসর যাপন ও নিজের পছন্দের কাজগুলো নিয়ে খোলা মেলা আলোচনা করতে দেখা গেলো তাঁকে। তার মতে ধারাবাহিক বাঁচিয়ে রেখেছে টলিস্টুডিও গুলোকে। পরামর্শ দিলেন সাহিত্য নির্ভর কাজ করলে আবার সুদিন ফিরে আসতে পারে। থিয়েটারটাকে প্রোফেশনাল না করলে, থিয়েটারের দল কমিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ না করলে, এটাও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে, কাজ কি যাবে বলে দুঃখপ্রকাশ করলেন তিনি।