Debasish Ganguly: দর্শকের আসন থেকে তাঁর নিজেকে সবসময় একজন এভারেজ এক্টর মনে হয়েছে। কিন্তু তাঁর অভিনয় বলে অন্য কথা। থিয়েটার দিয়ে যাত্রা শুরু করে বছরের পর বছর টলি দর্শককে হাসিয়েছেন তিনি তাঁর অসামান্য অভিনয় দক্ষতা দিয়ে, সংবাদমাধ্যমের একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেতা দেবাশীষ গাঙ্গুলি ভাগ করে নিলেন নিজের কিছু অভিজ্ঞতা।
নিজেকে, নিজেই পর্দায় দেখতে খুব অসুবিধাবোধ করেন অভিনেতা। তিনি মনে করেন, “ইশ এই জায়গাটা হলো না। তাই কোনো ছবির প্রিমিয়ারেও যাই না। সম্প্রতি রাজু মজুমদার পরিচালিত ‘ফনি বাবু ভাইরাল’ মুক্তি পেয়েছিল তার প্রিমিয়ারেও যাইনি। মনে হয়েছে অতসব মহান শিল্পীরা আছেন, তার মাঝে আমাকে দেখে কেউ যদি কিছু বলে কিংবা সেই বলাটাও স্বাভাবিক, আমি নিজেকে নিজে বেমানান লাগবে এই জন্য সেই ভয়েও যায়নি।”
অভিনয় নিয়ে ভাবনা থেকে এক বান্ধবীর পরামর্শে ‘থিয়েটারে’ যোগ দেওয়া দিয়েই শুরু তাঁর অভিনয় জগতে পদার্পণ। বেশ কয়েক বছর ওই দলের হয়ে অভিনয় করার পর সরে গিয়েছিলেন অভিনেতা। তখন দলের সিনিয়রদের কাছ থেকে “কিরে ঘর সংসার করছিস হয়ে গেলো অভিনয়” এরকম কিছু বিদ্রুপের সম্মুখীনও হতে হয়েছে অভিনেতাকে। তারপর ‘বাংলার ডাকাত’ নামের একটি ধারাবাহিক দিয়ে ছোটপর্দায় ডাকাতের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তাঁর জাঁদরেল গোঁফ ও অস্বাভাবিক মোটা ভুরুই ছিল দর্শকদের মূল আকর্ষণ। তবে এই ভুরু নিয়ে অনেক বিদ্রুপেরও সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে। মানুষ মনে মনে হাসতেন তাঁকে দেখে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানান, “মানুষের একটা খুত পেলে মানুষ খুব এনজয় করে না! আমাদের মধ্যে সেই একটা বীভৎসতা আছে। ভালোটা কিছু মানুষ ওইভাবে মনে রাখে না, বলে না। খারাপটাই সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।”
রূপ নিয়ে কটাক্ষের শিকার হওয়া এটা কখনও খারাপ লেগেছে কিনা? প্রশ্ন করা হলে অভিনেতা বলেন, “রূপটা কখনও বদলের চেষ্টা করিনি। কারণ ওই রূপে আমার মা, আমাকে সারা জীবন ভালোবাসা দিয়েছেন এবং বাবা ভালোবাসা দিয়েছেন যতদিন ছিলেন। তাই ওই রূপেই ক্যামেরার সামনে আসা।”
তখন ডিরেক্টর জিজ্ঞাসা করতেন “গোঁফটা অরিজিনাল? ভুরুটা নিজের? এবং তারপর দেখলাম ওই গোঁফ, ভ্রু-কে কেন্দ্র করেই আমার কথা ভাবা হয়।” দেবাশীষ নামের পাশে অনেকে যোগ করতেন জোড়া ভ্রু।
প্রতিবাদ করে অভিনেতা বলতেন, “কই জোড়া ভ্রু নয়তো আমার।” বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান শৈলেন দাশগুপ্ত, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্রেজ নেফ ওই মানুষগুলোর সাথে তাঁর তুলনা করে হতো ভ্রুর সাদৃশ্যের জন্য।
একজন সিনিয়র অভিনেতা তাঁকে শিখিয়ে ছিলেন কাজ প্রত্যাখ্যান করতে। উপদেশ দিয়েছিলেন, “না করলে তোর কাজের সংখ্যা কমিয়ে দেবে হয়ত। কিন্তু মানুষ ভাববে তুইও না করতে পারিস”, দেবাশীষ মেনেছিলেন সেই উপদেশ।
অভিনেতা জানালেন, “একটা সময় ছিল কাজ চলে গেলে হাউহাউ করে কাঁদতাম । এখন আর কোনো আক্ষেপ নেই, অভিযোগ নেই। যেটুকু আছে নিজের অন্তরে আছে। সবসময় কি স্টারদের নেপথ্যে থেকে গেলেন অভিনেতা? কমিডি বা চাকরের রোল ছাড়াও সিরিয়াস রোলে কি অভিনয় করতে পারতেন তিনি? উত্তরে বললেন, “এই সেইদিন সুমন মৈত্রর সাথে কথা হচ্ছিল, বললেন এখন বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে ওই ছবি রিলিজের ক্ষেত্রে যে একটা অর্থনৈতিক সমস্যা বলছে, দেখো ছবিটা-তো অনেক কষ্ট করে তৈরি করেছি। কিন্তু রিলিজের জন্য এই টাকাটা বলছে, এটা আমি এখনও অ্যারেঞ্জ করে উঠতে পারিনি। আবার আমার একজন প্রডিউসারকে বললে, সে বলবে, তুমি যেই টাকাটা বলছ তার ওয়ান পার্সেন্টও কি তুমি ফেরত দিতে পারবে হলে চালিয়ে? কারণ ছবি ভালো কি মন্দের ওপর দর্শক যাচ্ছে না, ছবি ভালো হলে তাও ভালো শহরের দর্শক দেখেন। আগে যেমন ছিল কি, বাংলা সিনেমা শহরের দর্শক যেমন দেখছে গ্রাম বাংলার মানুষও তেমন দেখছে। বাংলা ছবির ধারা পরিবর্তনের সাথে সাথে কমার্শিয়াল ধরাটাও শেষ হয়ে গেছে।”
বলিউডের ‘পাঠান’ ছবির উদাহরণ দিয়ে বললেন শাহারুক খানের দু’বছরের অনুপস্থিতি ভোর পাঁচটার শো হাউসফুল করে দিতে পারল। বাংলার এরকম উদাহরণ আছে কি? আগে ছিল তাই তখন ওই রকম বড় বড় স্টারদের নেপথ্যে থেকে যাওয়া টাও নিজের একটা পরিচিতি বলেই গণ্য করেন তিনি।
তাঁর খুব কম ইন্টারভিউ সংখ্যা বড় বড় প্রোডাকশনের ছবিটিও তাকে কেন দেখা যায় না?
প্রশ্ন করলে বলেন, “তারা জানেই না। এই জানবেই বা কেন! আমি হয়ত সেরকম কিছু করে উঠতে পারিনি। সেটা আমার ফল্ট।” তাঁকে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল কাজের জন্য যোগাযোগ করতে হয় নিজে থেকে প্রোডাকশন হাউসে গিয়ে বলতে হয় কাজের জন্য কিন্তু সেটা যে সবচেয়ে দুর্বলতম স্থান অভিনেতার। কাজের জায়গায় সম্পর্ক বজায় রাখতে হয় যেটা তিনি নিজের চরম ব্যর্থতা বলেই স্বীকার করলেন দেবাশীষ।
ইন্ডাষ্ট্রি তাকে ভরিয়ে দিয়েছে তারপরও তাঁকে থাকতে হচ্ছে দমদমের এই দুই কামরার ফ্ল্যাটে এটার পেছনে কি রয়েছে কোনো খারাপ লাগা? সেই প্রসঙ্গে অভিনেতা “কি উপহার সাজিয়ে দেবো গান আছে তাই শুনিয়ে যাব” গানটি গেয়ে বললেন তিনি যা পেয়েছেন তার যোগ্যতার নিরিখেই পেয়েছেন। দুঃখটা নিজের কাছেই রেখে দেওয়া উচিত। কাজ না পাওয়া থেকে শুরু করে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে কাজ না দেওয়া সবকিছুই অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। কিন্তু কোনো কিছু নিয়েই নেই তাঁর কোনো আক্ষেপ।