Debolina Nandy: সংগীতশিল্পী দেবলীনা নন্দী এবং তাঁর স্বামী প্রবাহ নন্দীর মধ্যকার পারিবারিক টানাপোড়েন এবার আইনি যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রতি স্বামীর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের কড়া জবাব দিতে দুই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে বারুইপুর মহকুমা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন দেবলীনা। একই সঙ্গে এক বিশেষ সাংবাদিক বৈঠক ডেকে নিজের স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে একাধিক শিউরে ওঠার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন এই গায়িকা। চলতি বছরের শুরুর দিকে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে দেবলীনার আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনার পর থেকেই মূলত এই তারকা দম্পতির বিবাদ প্রথম প্রকাশ্যে আসে।সাংবাদিক বৈঠকে দেবলীনার আইনজীবীরা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দেবলীনা নন্দী ও প্রবাহ নন্দী। তবে বিয়ের পর থেকেই গায়িকার ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। বিগত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ডে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে মদ্যপ অবস্থায় দেবলীনাকে মারাত্মকভাবে মারধর করেন প্রবাহ।
আইনজীবীদের দাবি, প্রবাহ নিয়মিত মদ্যপান ও মাদক সেবন করতেন। এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি এনে দেবলীনার আইনজীবী জানান, “প্রবাহ পেশায় পাইলট হওয়ায় মদ্যপানের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকত। পরের দিন সকালে ফ্লাইট থাকলে সে আগের দিন সকাল থেকেই মদ্যপান শুরু করে দিত। মদ্যপ অবস্থায় হাত মোচড়ানো বা কনুই দিয়ে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনা হামেশাই ঘটত। শুধু তাই নয়, নিউটাউন-এর ভাড়া বাড়ির ৬ তলার বারান্দা থেকে দেবলীনাকে বহুবার নীচে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে সে। আইনজীবীদের দাবি, এই ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টার ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন যিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। এছাড়া নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে বেশকিছু অডিও-ভিডিও ক্লিপ এবং ছবিতে মেকআপ দিয়ে ঢেকে রাখা কালশিটে দাগের প্রমাণও আদালতে পেশ করা হবে। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দেবলীনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নিউটাউনের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় চন্দননগর, সোনারপুর ও নিউটাউন এই তিন থানাতেই সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরবর্তীতে প্রবাহ দেবলীনাকে পুনরায় বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেও অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রবাহর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন করে বলা হতো ‘তুমি কেন মরে যাও না? তুমি মরলে আমাদের সবার জীবন সহজ হবে।’ দিনের পর দিন এই অসহ্য মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরেই ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টা করেন গায়িকা। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই সোনারপুর থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।দেবলীনার আইনজীবীদের অভিযোগ, বিয়ের আগে প্রবাহ ও তাঁর পরিবার নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক স্থিতি নিয়ে যেভাবে জাহির করেছিল, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। নিউটাউনের যে ফ্ল্যাটটি নিজেদের বলে দাবি করা হয়েছিল, তা আসলে একটি ভাড়া বাড়ি ছিল। এছাড়া বিয়ের আগে ও পরে প্রবাহ এবং তাঁর ভাই বিভিন্ন সময়ে অনলাইন ট্রানজাকশনের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছেন, যা কার্যত পণেরই সমান। এমনকি দেবলীনার প্রায় ১৫ গ্রাম ওজনের একটি সোনার হারসহ প্রায় ৬৯ গ্রাম গয়না ফেরত দিতেও অস্বীকার করেছে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। এই নির্যাতনের আঙুল উঠেছে দেবলীনার শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধেও, যার কারণে গার্হস্থ্য হিংসা মামলায় তাঁদেরও বিবাদী করা হয়েছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, প্রবাহর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাবা-মা দেবলীনাকে চরম হেনস্থা করতেন এবং তাঁর সাথে ‘ব্যাড টাচ’ বা অসদাচরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি দেবলীনার মায়ের গায়ের রং তুলে প্রতিনিয়ত গালিগালাজ ও অপমান করা হতো এবং দেবলীনাকে তাঁর নিজের পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলত। আইনজীবীরা স্পষ্ট করেছেন যে, প্রবাহর করা জুডিশিয়াল সেপারেশনের মামলায় ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ জারি করেছে। বর্তমানে বারুইপুর মহকুমা আদালতে গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইনের অধীনে মূল মামলাটি চলছে। তাছাড়া, সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবলীনার একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও বিকৃতভাবে পোস্ট করে তাঁকে মদ্যপ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করায় গত ১৩ তারিখে প্রবাহর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে একটি জামিন অযোগ্য ধারায় মানহানির মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রবাহ যাতে আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য আদালত যাতে তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে, সেই আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন আইনজীবীরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছেও আবেদন জানানো হচ্ছে যাতে উড়ানের সময় শত শত যাত্রীর সুরক্ষার স্বার্থে এমন একজন অভিযুক্তকে বিমান চালাতে না দেওয়া হয়।
এই সাংবাদিক বৈঠকে নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে দেবলীনা জানান, “আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংসারটা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার জামাকাপড় ঠিক নেই, আমি কাঁদছি এমন একটা ব্যক্তিগত ভিডিয়ো ওরা সোশাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিল। যে স্বামী বলে সে বউকে ভালোবাসে, সে কীভাবে এই কাজ করে? আমার সম্মান ওরা কোথায় রাখল জানি না। এতদিন সবাই জানতে চাইত আমি কেন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি না, আজ ওদের সামনে সব স্পষ্ট করলাম। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে, ঠিক জায়গায় আমি তা জমা দেব।”